যে উপায়ে ইতি ঘটতে পারে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের

টিবিটি ডেস্ক
টিবিটি ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১০:১৮ এএম

ইউক্রেনে ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া সর্বাত্মক আক্রমণ করে। সেই যুদ্ধ দুই বছর গড়িয়ে তিন বছরে পা দিতে যাচ্ছে। দুই দেশের সেনাদের তীব্র লড়াইয়ে অনেক শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, প্রাণ হারিয়েছেন লাখো মানুষ। কয়েক লাখ মানুষ হয়েছেন বাস্তুচ্যুত।

প্রথম দিকের আক্রমণে ইউক্রেনে ৩ লাখ ৬০ হাজার সেনার বিশাল বাহিনী প্রবেশ করেছিল। সব প্রতিকূলতাকে ছাপিয়ে ইউক্রেনীয় সেনারা তাদের কিয়েভের প্রবেশপথে আটকে দেয় এবং উত্তর ইউক্রেন থেকে বিতাড়িত করে। পরে তারা খেরসন মুক্ত করে আরও জয় পায়। খারকিভেও তাদের সাফল্যে পরাজিত হয় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সেনারা।

কিন্তু গত বছর ইউক্রেনের বহুল প্রতীক্ষিত পাল্টা আক্রমণ থমকে যায় সামান্য ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের পর। আর এতে কার্যত রণক্ষেত্রে অচলাবস্থা বিরাজ করছে।

সর্বশেষ ১৭ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনীয় সেনারা আভদিভকা থেকে পিছু হটেছে। এই শহরকে ডনেস্কে প্রবেশের পথ হিসেবে মনে করা হয়। ২০২৩ সালের মে মাসে বাখমুত দখলের পর আভদিভকায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে রুশ বাহিনী।

যুদ্ধের সমাপ্তি কবে হবে তা এখনও তা অস্পষ্ট। দুই বছর পূর্তিতে এই যুদ্ধের সম্ভাব্য চার পরিণতির কথা তুলে ধরেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম বিজনেস ইনসাইডার।

টিকে যাবে ইউক্রেন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেনের আশার জায়গা হলো পশ্চিমা সহযোগিতার অব্যাহত প্রবাহ এবং দীর্ঘ ও চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে রাশিয়ার নৈতিক অধঃপতন। 

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর ইউরোপ, রাশিয়া ও ইউরেশিয়া কর্মসূচির পরিচালক ম্যাক্স বার্গম্যান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামরিক ও আর্থিক সহযোগিতার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল ইউক্রেন। এই সহযোগিতা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে দেশটির সেনারা রাশিয়ার আক্রমণ ঠেকিয়ে দিতে পারে।

বার্গম্যান ইঙ্গিত দিয়েছেন, মার্কিন কংগ্রেসে যে ৬০ বিলিয়ন ডলার সহযোগিতা বিল নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, তা যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, এই বিল যদি পাস হয় তাহলে আমার কোনও সন্দেহ নেই ইউক্রেন ২০২৪ সালে রাশিয়ার আক্রমণ পুরোপুরি ঠেকিয়ে দেবে। আসলে আমি আরও একটু বেশি আশাবাদী ২০২৫ সালে ইউক্রেনের সম্ভাবনা নিয়ে। 

সিনেটে পাস হওয়া সহযোগিতা বিলটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে পাঠানো হবে। সেখানে রিপাবলিকানদের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে তা। 

যুদ্ধে ইউক্রেন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যও পেয়েছে। যা যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে কর্মকর্তারা বলছেন ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সাফল্যের কথা। সেখানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুশ যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে তারা। 

এই জাহাজগুলো রাশিয়ার জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো দক্ষিণ ইউক্রেনের রণক্ষেত্রে রুশ সেনাদের কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পরিবহন করত।

সিএসআইএস-এর এলিয়ট অ্যা. কোহেন বলেন, ফলে সাগরে অভিযানে ইউক্রেনের উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে। সামরিক নেতৃত্বে পরিবর্তনও যুদ্ধের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আমি মনে করি না ইউক্রেনীয় হাল ছেড়ে দেবে। কারণ এটি তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। রাশিয়ার জন্য তা নয়।

রাশিয়ার জয়
কোহেন বলেছেন, যুদ্ধে রাশিয়া উল্লেখযোগ্য গোলাবারুদ মজুত ও সেনা হারিয়েছে। পশ্চিমা সহযোগিতা না পেলে তা ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সেনাদের সামরিক ও মানসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে হাজির হতে পারে।

তিনি বলেন, আমি মনে করি এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ যে মানুষ মনে করে না ইউক্রেনের ওপর বিশ্বাস হারিয়েছে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। 

কোহেন ও বার্গম্যান উভয়েই তুলে ধরেছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে জার্মানির আকস্মিক পতনের কথা। তারা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও এমনটি যেকোনও সময় ঘটতে পারে।

বার্গম্যান বলেছেন, ইউক্রেনের জন্য পশ্চিমা সহযোগিতা কমে আসছে, অচল যুদ্ধ রাশিয়ার পক্ষে যাবে।

কোহেন বলেছেন, এমন যুদ্ধে কোনও পক্ষের শক্তি যদি ক্ষয় হয়ে যায় তাহলে অন্যপক্ষ অচলাবস্থা ভেঙে ফেলার সুযোগ পায়। ফলে আমি মনে করি মার্কিন সহযোগিতা ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। 

কোহেন আরও বলেছেন, আমি মনে করি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কৌশল ফলপ্রসূ হতে পারে। কেউ প্রত্যাশা করেনি ১৯১৮ সালের নভেম্বরে যুদ্ধের ইতি ঘটবে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের শুরুতেও মানুষ ১৯১৯ সালের পরিকল্পনা করছিল। কিন্তু এরপর শুধু একটি বিপর্যয় নয়, একগুচ্ছ বিপর্যয় ঘটে। আমি মনে করি এক্ষেত্রেও এমন কিছু ঘটতে পারে।

শান্তিচুক্তি
জানুয়ারিতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ এক প্রতিবেদনে দাবি করেছিল, মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নিয়েছেন পুতিন। যার অর্থ হলো, যুদ্ধ অবসানে আলোচনার জন্য তিনি প্রস্তুত রয়েছেন।

কিন্তু ক্রেমলিন মুখপাত্র এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, বাস্তবতার সঙ্গে এই প্রতিবেদনের কোনও সম্পর্ক নেই।

মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নারী মুখপাত্র আদ্রিয়েন ওয়াটন বলেছিলেন, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা রাশিয়ার অবস্থানের পরিবর্তনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র অবগত নয়। রাশিয়ার সঙ্গে কবে, কখন ও কীভাবে আলোচনা হবে তা নির্ধারণ করবে ইউক্রেন।

রয়টার্স এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, রুশ প্রেসিডেন্ট পরোক্ষভাবে একটি যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত দিয়েছেন। ইউক্রেনের সংশ্লিষ্টতা না থাকলে কোনও কিছু বিবেচনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

পারমাণবিক যুদ্ধ
ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর একাধিকবার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়েছেন পুতিন। কিন্তু এই হুমকিকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে, তা নিয়ে পশ্চিমারা বিভক্ত।

সিএসআইএস-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সেথ জোনস বলেছিলেন, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। পুতিন যদি এসব অস্ত্র ব্যবহার করেন তাহলে রুশ ভূখণ্ডেও পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জোনস বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার রীতি ভঙ্গে সুবিধার চেয়ে ঝুঁকি বেশি থাকবে।

তিনি বলেন, পুতিনের শাসনের জন্য এর কী অর্থ? আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিয়েছে, রাশিয়া যদি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে তাহলে কী ঘটবে বলা মুশকিল।

সূত্র: বিজনেস ইনসাইডার