স্বামীকে আটকে স্ত্রীকে ধর্ষণ

জাবি ছাত্রলীগ নেতাসহ গ্রেপ্তার ৪

টিবিটি ডেস্ক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৪:০৮ এএম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হলে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর শাখা ছাত্রলীগের এক নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাকে পালাতে সহযোগিতা করায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরও তিনজনকে।

শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলসংলগ্ন জঙ্গলে এ ধর্ষণের ঘটনার পর প্রধান অভিযুক্তকে রোববার ভোরে সাভার থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস্ ও ট্র্যাফিক, উত্তর বিভাগ) আব্দুল্লাহিল কাফি।

ধর্ষণে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা মোস্তাফিজুর রহমান আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। মোস্তাফিজ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিক-বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন ও সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

ধর্ষণে অভিযুক্ত আরেক যুবক মামুন বহিরাগত। তিনি ভুক্তভোগী নারীর বাসায় ভাড়া থাকতেন ও মাঝে মাঝে মীর মশাররফ হোসেন হলের ‘এ’ ব্লকের ৩১৭ নম্বর কক্ষে মোস্তাফিজের কাছে এসে থাকতেন।

৩১৭ নম্বর কক্ষটি ব্যবহার করতেন মোস্তাফিজ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক মুরাদ হোসেন।

এ ঘটনায় মোস্তাফিজকে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ। তবে ধর্ষণের ঘটনা জানাজানি হলের ফটকে প্রশাসনের লাগানো তালা ভেঙে অভিযুক্তদের হল থেকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন বলে অভিযোগ উঠেছে ওই হলের ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগী ওই নারী জানান, তাদের বাড়ি আশুলিয়ার জিরানী এলাকায়। শনিবার সন্ধ্যায় তার স্বামীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরতে নিয়ে আসেন তাদের বাসায় ভাড়া থাকা মামুন।

এ সময় তার স্বামী কিছু আসবাবপত্র কেনার কথা জানালে মামুন তাকে বলেন, এক আসবাবপত্র দোকানে তার টাকা পাওনা আছে, কিন্তু দোকানদার টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। ওই দোকান থেকে আসবাবপত্র কিনে টাকাটা যাতে মামুনকে দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী আরও বলেন, স্বামীর সঙ্গে তারও আসবাবের দোকানে যাওয়ার কথা, তাই স্বামী ফোন করে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে বলেন। আসার সময় বাসা থেকে মামুনের কিছু জামা-কাপড়ও নিয়ে আসতে বলেন। কারণ, মামুন কয়েক দিন ক্যাম্পাসে মোস্তাফিজের কাছে থাকবেন।

এরপর মোস্তাফিজ ও মামুন ভুক্তভোগীর স্বামীকে মীর মশাররফ হোসেন হলে আটকে রাখেন। পরে ওই নারী মামুনের জামা-কাপড় নিয়ে ক্যাম্পাসে এলে তার কাছ থেকে সেগুলো নিয়ে হলের কক্ষে রেখে আসে মামুন।

ভুক্তভোগী নারী অভিযোগ করেন, মামুন ফিরে এসে ওই নারীকে বলেন, তার স্বামী হলের অন্য ফটক (জঙ্গলের দিক) দিয়ে আসবেন, সেদিকে যেতে। তিনি সেই পথে গেলে মোস্তাফিজ ও মামুন তাকে হলসংলগ্ন জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করেন।

এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী অবস্থান করে বিক্ষোভ করেন। এ সময় তারা ‘ক্যাম্পাসে ধর্ষক কেন, প্রশাসন জবাব চাই’; ‘ধর্ষণমুক্ত ক্যাম্পাস চাই’; ‘ধর্ষকদের পাহারাদার, হুঁশিয়ার সাবধান’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন।

এর মধ্যে অভিযুক্তদের খুঁজতে কর্তৃপক্ষ ওই হল থেকে বের হওয়ার চারটি ফটক বন্ধ করে দেন। কিন্তু একটি ফটকের তালা ভেঙে দুই অভিযুক্তকে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন শাখা ছাত্রলীগের কর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী সাগর সিদ্দিকী। আরেকজন শাখা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাব্বির ও তাদের সঙ্গে সহযোগী হিসাবে ছিলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী হাসান।

হাসান সাংবাদিকদের বলেন, “আমি এটা জানতাম না। ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি শাহ পরাণ ভাইয়ের নির্দেশে আমি তালা ভাঙতে যাই। গিয়ে দেখি সাগর সিদ্দীকি ও সাব্বির সেখানে উপস্থিত আছে। আমরা তিন জন মিলে তালা ভেঙে ফেলি।”


অভিযুক্তরা সবাই শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আক্তারুজ্জামান সোহেলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। হলের নিরাপত্তারক্ষী দুলাল মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, “আমি তাদেরকে তালা ভাঙতে দেখেছি।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক সাব্বির আলম বলেন, “ঘটনাটা শুনেছি। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেল বলেন, “উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে মোস্তাফিজকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মোস্তাফিজের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে আবারও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, “ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, আমরা রাষ্ট্রীয় আইনে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করব।”

এদিকে রোববার বেলা ১২টার দিকে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহিল কাফি বলেন, “ প্রধান আসামি মোস্তাফিজকে সাভার থানা এলাকা থেকে ভোরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

এছাড়া সকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের সহযোগিতায় সাব্বির হাসান সাগর, সাগর সিদ্দীকি এবং হাসানুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অভিযুক্ত মোস্তাফিজকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “আমরা সকলকে আশ্বস্ত করতে চাই, যে-ই অপরাধী হোক না কেনো তার পার পেয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমরা কাজ শুরু করি এবং ছয় জন আসামির মধ্যে চার জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই।”

“বাকী দু’জনকে গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। আশা করছি দ্রুতই তাদের গ্রেপ্তার করতে পারব।”

তারা অভিযোগ স্বীকার করেছে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপাতত এতটুকু আপনাদের জানানো হয়েছে। বাকী বিষয় তদন্তের পরে আবার জানানো হবে।”